করোনা পরিস্থিতিতে থমকে গেছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, রাখাইনে নতুন করে সংঘাতের ঘটনায় হতাশা

 26 total views,  2 views today

নিউজ ডেস্ক

বিশ্বব্যাপী চলমান মহামারি করোনা ভাইরাসের কারনে থমকে গেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরার প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। এছাড়া করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও রাখাইনে মিয়ানমার বাহিনীর বিধ্বংসী অভিযান রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন করে হতাশার জন্ম দিয়েছে। একটি সূত্র মতে, ২০১৭ সালের আগস্টের অভিযানের চেয়েও রাখাইনে বর্তমানে আরো ভয়াবহ অভিযান পরিচালনা করছে মিয়ানমার। ফলে সেখানে কী ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে তার প্রকৃত তথ্যও বাইরে আসেনি কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে। সাম্প্রতিককালে সিআরআই আয়োজিত অনলাইন সেমিনারে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনও বলেন, ক্লিয়ারেন্স অপারেশনে রাখাইনে যে সহিংসতা চালানো হচ্ছে তাতে বহু বেসামরিক মানুষ হতাহত হচ্ছেন। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির যে সংঘাতময় পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির সহায়ক নয়।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত করার জন্য ‘চোরাবালি কূটনীতি’ অনুসরণ করছে মিয়ানমার। এ ধরনের কূটনীতির মাধ্যমে তারা বাংলাদেশকে শুধু নয় পুরো বিশ্বকেই বোকা বানাচ্ছে। ‘চোরাবালি কূটনীতি’র ব্যাখ্যা করে সূত্র জানায়, চোরাবালি সাদা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু যাওয়ার পথে তার মধ্যে হুট করেই হারিয়ে যায় পথিক। কূটনীতিতেও ঠিক এমন ফাঁদ তৈরি করাকেই চোরাবালি কূটনীতি বলা হয়ে থাকে। মিয়ানমার বারবার বলেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে আনবে। তাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র চীনও বলছে, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে দ্বিপক্ষীয় ইস্যু। বাংলাদেশ সেই কথায় বিশ্বাস রেখে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন চুক্তি করেই কূটনীতির চোরাবালিতে আটকে গেছে। এখন অবস্থাটা বিশ্বজুড়ে যত জায়গায় বাংলাদেশ প্রত্যাবাসন নিয়ে কথা বলছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বিষয়টি সামনে নিয়ে এসে বলছে, তারা চুক্তি অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে, আলোচনা চলছে। চীনও এই চুক্তির কথা তুলে ধরে মিয়ানমার চুক্তির পথ ধরেই এগোচ্ছে- এমন বার্তা দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিভ্রান্ত হচ্ছে। তাদের সামনেও এই চুক্তি একটি গোলকধাঁধা তৈরি করে রেখেছে। দুটি দেশ যখন একটা চুক্তি করেই ফেলেছে, তখন সংকট সমাধানে তারা চূড়ান্ত ধাপেই আছে, অতএব ‘দেখা যাক, কি হয়’- এমন একটা অবস্থানে তারা থেকে যাচ্ছেন। তারপরও পশ্চিমা দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে কিছু কিছু পদক্ষেপ এসেছে, যেগুলো শেষ পর্যন্ত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় খুব বেশি ভূমিকা রাখেনি।

এই চোরবালির কূটনীতি থেকে বের হওয়ার উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে সূত্র জানায়, এখন এ চুক্তি বাতিল করাও বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ মিয়ানমার তখন আরও বেশি নেতিবাচক প্রচার চালাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। এখন একটাই উপায় হচ্ছে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বহাল রেখেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে সংকটের স্থায়ী সমাধান সংক্রান্ত একটি চুক্তি করা যেখানে বহুপাক্ষিক রূপ দেওয়া হবে জাতিসংঘের মাধ্যমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ বা পক্ষকে সাক্ষী হিসেবে রেখে। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারলে এবং চুক্তির শর্ত না মানলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কি পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেটাও চুক্তিতে পরিস্কার উল্লেখ থাকতে হবে। কারণ দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে প্রত্যাবাসনের জন্য সুনির্দিষ্ট সীমা নেই এবং প্রত্যাবাসন না হলে কি পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেটাও বলা ইে। বরং চোরাবালি কূটনীতির চুক্তিতে বিষয়টা এমন দাঁড়িয়েছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন না হলে তার দায় বাংলাদেশের ওপরই পড়বে।

সূত্র জানায়, করোনা মহামারির কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এখন নেই বললেই চলে। বরং রাখাইনে সংঘাত এবং রোহিঙ্গাদের সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করছে। এই অবস্থায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আরও দীর্ঘসময় রেখে বাংলাদেশকে আরও বেশি সহায়তা দেওয়া যায় কি-না সেটা নিয়েও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে আলোচনা চলছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়েই চেষ্টা করে যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের নীতিতে বাংলাদেশ অটল। কিন্তু সেই সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার জন্য মিয়ানমারের যেটা করণীয় সেটা দেখা যায়নি। রাখাইনে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির বদলে সহিংসতা, অস্থিরতার খবর আসছে। আবার বাংলাদেশের পক্ষে রোহিঙ্গা সংকটের বোঝা দীর্ঘদিন বহন করাও অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বিশ্বের যেসব দেশের সামর্থ্য আছে এবং যারা রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার তারা রোহিঙ্গাদের নিয়ে গিয়ে আশ্রয় দিলে সেটা ওই দেশের জন্য বড়মাপের আন্তরিকতার পরিচয় হবে। তিনি বলেন, কভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতি বিশ্ব বাস্তবতার অনেক কিছুতেই বড় ধাক্কা দিয়েছে। তবে এই পরিস্থিতির একটু উন্নতি হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ আবারও গতি পাবে।

Share this:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *