রোহিঙ্গাদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ করতে পারে বাংলাদেশ- যুক্তরাজ্য!

নিউজ ডেস্ক

মায়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতন আর হত্যাযজ্ঞ থেকে প্রাণে বাঁচতে সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে আসা বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে বাংলাদেশের কক্সবাজারের আশ্রয় দিয়েছে সরকার। সেখানে তাদের নিরাপত্তায় বেশ কয়েকটি নিরাপত্তাবাহিনীর কয়েক হাজার সদস্য মোতায়েনসহ আন্তর্জাতিক সহায়তায় রোহিঙ্গাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সব কিছুর তদারকিও করছে বাংলাদেশ। এমনকি তাদের নিজ দেশে নিরাপদে প্রত্যাবাসনের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের সাথে দফায় দফায় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তারা। এমতাবস্থায় যুক্তরাজ্য ভিত্তিক একটি আইনজীবীদল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের তুলাতলি গ্রাম থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ৮৬ জন রোহিঙ্গার আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি)তে একটি আবেদনে ‘বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ করে থাকতে পারে বা ভবিষ্যতে করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।’ রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদে প্রত্যাবাসন এবং বাংলাদেশের ভাসানচরে স্থানান্তর নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্যের অংশ বিশেষ উল্লেখ করে আইসিসির কাছে আবেদনে আইনজীবীদল আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, মিয়ানমারে ফিরে যেতে বাধ্য করতে রোহিঙ্গা শিবিরে প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে।

গত ৩রা অক্টোবর আইসিসির প্রাক-বিচারিক আদালত-৩-এর কাছে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক আইনজীবী দলটি জানায়, কক্সবাজারে অমানবিক পরিস্থিতিতে বসবাস, রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম নিবন্ধন না করা, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বাংলাদেশিদের বিয়ের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা, আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও অবাধ চলাফেরার সুযোগ না দেওয়া, জোরপূর্বক মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো এবং ভাসানচরে স্থানান্তর করার উদ্যোগ এক প্রকার মানবতাবিরোধী অপরাধ। তাদের মতে, বাংলাদেশ এরই মধ্যে এগুলোর বেশ কয়েকটি করে থাকতে পারে বা ভবিষ্যতে করতে পারে।

আইসিসির কৌঁসুলি ফেটু বেনসুডা মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের গণবাস্তুচ্যুতির পূর্ণ তদন্ত শুরু করার অনুমতি চেয়ে আইসিসিতে করা আবেদনের বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা তাদের আইনি প্রতিনিধিদের স্বেচ্ছায় মতামত জানানোর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেশ কিছু আবেদন বা অভিমত জমা হয়েছে আইসিসিতে। সেগুলোর মধ্যে আইসিসির কৌঁসুলির আবেদনের পক্ষে যুক্তি যেমন আছে, তেমনি কিছু ভিন্নমতও আছে। মিয়ানমার সরকারের প্রতিনিধি নয় বলে দাবি করা একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আইসিসিতে তাদের আবেদনে কার্যত মিয়ানমার সরকারের দৃশ্যমান অবস্থানই তুলে ধরেছে। রোহিঙ্গাদের ‘বিদেশি’ হিসেবে ইঙ্গিত করে সেসব আবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আসার কারণ নির্যাতন-নিপীড়ন নয়। পূর্ণ তদন্ত শুরু করতে আইসিসির কৌঁসুলির আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রাক-বিচারিক আদালত-৩-এর বিচারকরা এসব আবেদনসহ সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে রায় দেবেন।

মিয়ানমার আইসিসিকে সহযোগিতা করবে না এবং অনেক বছরেও অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা যাবে না—এমন আশঙ্কা ও চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও তুলাতলির ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গারা তদন্ত চায় বলে আদালতকে জানিয়েছেন তাদের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবীরা। তাঁরা আরো জানান, অপরাধের শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গারা আইসিসির কৌঁসুলির তদন্তের পরিসর বিস্তৃত করার পক্ষে মত দিয়েছে। আইনজীবীরা আবেদনে বলেছেন, তুলাতলি গ্রামের রোহিঙ্গাদের নিয়েও তদন্ত হতে পারে। বাংলাদেশে আশ্রিত মিয়ানমারের তুলাতলি গ্রামের রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগই ২০১৭ সালে এ দেশে আশ্রয় নিলেও তাদের ওপর ২০১০ সাল থেকেই গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হচ্ছিল। রোহিঙ্গাদের দেশছাড়া করার পরিকল্পনা যে মিয়ানমারের আগেই ছিল, তারও কিছু দালিলিক প্রমাণ দেওয়া হয়েছে আবেদনের সঙ্গে।

সরকারি সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, রোহিঙ্গাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মিয়ানমারে ফেরত না পাঠানোর বিষয়ে সরকারের নীতিগত অবস্থান রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি সত্ত্বেও রোহিঙ্গারা রাজি না হওয়ায় প্রত্যাবাসন শুরু করার দুই দফা উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। সরকার যে রোহিঙ্গাদের জোর করছে না, তা-ও এতে স্পষ্ট। ভাসানচরের বিষয়েও সরকারের অবস্থান হলো রোহিঙ্গাদের মঙ্গলের কথা চিন্তা করেই তাদের একাংশকে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। রোহিঙ্গাদের সম্মতির ভিত্তিতে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা নিয়েই বাংলাদেশ ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চায়।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ২৫শে আগষ্ট নিজ দেশের সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ করতে চাইলে সেসময় বাংলাদেশ সরকার তাদের বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি প্রদান করে। এরপর থেকে দফায় দফায় আলোচনার পর দুই দফায় রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকার। একটি সূত্র মতে সেময় কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত বেশ কয়েকটি এনজিও সংস্থার প্ররোচনায় নিজ দেশে ফেরত যাওয়া থেকে বিরত থাকে রোহিঙ্গারা। এতে করে দুই দফাতেই ভেস্তে যায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন।

Share this:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *