প্রেক্ষিত: দুর্নীতি প্রতিরোধ

খগেশ্বর ত্রিপুরা

জগতের সবকিছুই পরিবর্তনশীল ও প্রবাহমান। এই পরিবর্তন ও ক্রমবিকাশ নিরন্তর। তবে পরিবর্তন ও ক্রমবিকাশের ধারা সহজ ছিলনা। দিন দিন ক্রমবিকাশের পদ্ধতি কঠিন হতে আর ও কঠিন হতে চলেছে। যেমন- মানুষের আচার আচরণ, ধ্যান ধারণা, কর্ম পদ্ধতি, প্রাকৃতিক অবস্থা, বিজ্ঞান, তথ্য প্রযুক্তি সবকিছুর পরিবর্তন মানুষের জটিল ও কঠিন চিন্তাধারার প্রতিফলন। এই জন্যে বলা হয় এ জগৎ জীবনকে নিয়ে তথা মানুষকে নিয়ে আর্বতিত। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন মানুষের আজকের যেসব সামাজিক রীতি নীতি, আচার অনুষ্ঠান, মূল্যবোধ সহ সবকিছু পরিবর্তন ও ক্রমবিকাশের ফল। প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও গ্রীক দার্শনিক এনাস্কে, সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টোটলও ডারোইনের এই বিবর্তন বাদের সাথে একমত পোষণ করেন। এরিষ্টোটলের মতে বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেকোন জিনিষ আকার ও উপাদান পরিবর্তনের জন্যে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে চলে এবং এই এগিয়ে চলার মাধ্যমেই কোন এক সময় পূর্ণতা লাভ করে। এরিষ্টোটলের এই মতবাদের সাথে বিবর্তনবাদ তত্বের অনেক বিষয় মিল রয়েছে। যেমন আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলেই ব্যক্তি হতে পরিবার, পরিবার হতে সমাজ, সমাজ হতে জাতি এবং জাতি হতে বৃহত্তর মানব সমাজের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে মানবজাতির পূর্ণতা অর্জন করেছে। অনূরূপভাবে লক্ষকোটি বালুকণার সমন্বয়ে দেশ, মহাদেশ, বিন্দু বিন্দু জলের সমারোহে ছড়াছড়ি নদনদী, সাগর মহাসাগর সৃষ্টির মাধ্যমে পূর্ণতা অর্জন করে। তেমনি ভাল ও মন্দ সহ পৃথিবীর সবকিছইু ক্ষুদ্রতম অবস্থা হতে বৃহৎপরিসরে ব্যাপ্তি লাভ করার জন্যে এগিয়ে চলছে। এই এগিয়ে চলা হচ্ছে “বর্তমান অবস্থার সৃষ্টি অতীতের পরিবর্তনের রূপ”। বিবর্তনবাদ ধারায় একজন ছাত্র দীর্ঘদিন যাবৎ প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে পড়ালেখার কারণেই উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করা সম্ভব হয়েছে, একজন কৃষক তার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কৃষি প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কাজ করার ফলেই একখন্ড জমিতে সোনার ফসল ফলায়। একজন গবেষক দীর্ঘদিন যাবৎ গভীর মনোনিবেশ সহকারে গবেষণা কর্মে মগ্ন থাকার কারণেই সফলতা অর্জন করে। একজন আর্দশনবান শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদেরকে অকৃত্রিম শিক্ষাদানের মাধ্যমে সু শিক্ষায় শিক্ষিত ও মানবসত্ত্বাধিকারী করে তোলে। কোন একটি পরিবারের শৃঙ্খলার কারণে সেই পরিবারের সন্তান সন্ততি নৈতিক আদর্শবান হলে সেই পরিবার আদর্শ পরিবার হিসাবে গড়ে উঠে। এইভাবে যদি সকল পরিবার আদর্শবান পরিবার হিসাবে গড়ে উঠে তবে সমাজ, আদর্শ সমাজ, দেশ আদর্শ দেশ, জাতি আদর্শ জাতি হিসাবে গড়ে উঠে। তখন সমাজ ইতিবাচক পরিবর্তন হয় এবং সভ্যতার ইতিবাচক ক্রমবিকাশ ঘটে। কিন্ত এই ইতিবাচক পরিবর্তন ও সভ্যতার ইতিবাচক ক্রমবিকাশ ঘটানো খুব সহজ নয়। মানুষের চিন্তা, চেতনা, মূল্যবোধ ও আচরণ ভংগি সহ সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি যতক্ষণ পর্যন্ত ইতিবাচক পরিবর্তন হবেনা ততক্ষণ পর্যন্ত তা সঠিকভাবে সম্ভব হবেনা। বিবর্তন প্রক্রিয়াতে শুরুতে পদার্থিক ও রাসায়নিক উপাদান সমূহও সরল অথচ এলোমেলো অবস্থায় থাকলেও আস্তে আস্তে সুশৃঙ্খল অথচ জটিলরূপ ধারণ করতে থাকে। মানবজীবনও সরল হতে যৌগিক, বিশৃঙ্খল হতে সুশৃঙ্খল, অনুন্নত হতে উন্নতির দিকে ক্রমবিকাশ হতে থাকে। কারণ বিবর্তনের ধারা বিছিন্ন নয়- ধারাবাহিক ও অনবছিন্ন। বিবর্তনের ধারাবাহিকতা লঙ্ঘন করে যদি পরিবর্তন হয় তবে সেটি হবে ব্যতিক্রমী পরিবর্তন; যে পরিবর্তন টেকসই হবেনা, পরিবর্তনের কাঙ্খিত সুফল অর্জন করা সম্ভব হবেনা, এমন কি কোন কোন ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলের বিপরীতে নেতিবাচক ফল বা কুফলও বয়ে আনতে পারে। সমাজ তখন ইতিবাচক পরিবর্তনের জায়গায় নেতিবাচক পরিবর্তন হয়, উন্নত সমৃদ্ধির স্থলে পিছু হাঁটতে থাকে।

এ পৃথিবীতে জীবের সৃষ্টির ধারা নারীদের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে চলছে। নারী এবং পুরুষের জীবাত্মার ইচ্ছা পূরণের মাধ্যমে নারীরা জীব জগতের এই ধারা নিরন্তর বহন করে চলেছে। কিন্তু নারী কিংবা পুরুষের এই ইচ্ছা পূরণের ক্রিয়া যখন প্রতিক্রিয়াতে রূপ নেয় তখন সেটি আর জীবাত্মরে নিয়ন্ত্রণে থাকেনা, তখন জৈবিক চাহিদা হতে পশুত্ব চাহিদা এবং সৃষ্টিশীলও সৎকর্মের জায়গায় ব্যাভিচার ও অসৎকর্মে পরিনত হয়। সৎকর্ম এবং পশুত্বকর্ম উভয় কর্মেই কিন্তু জীব জগতের উম্মষ ঘটে। এই ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সৎকর্মকেই কর্ম বলে অসৎকর্মকে দুস্কর্ম বা অকর্ম এমনকি ব্যাভিচার কর্ম ও বলা যেতে পারে। জগৎ বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন “জ্ঞান ও কর্ম এক” কারণ জ্ঞান যদি কর্মে রূপান্তর না হয় তাকে জ্ঞান বলা যায় না এবং কর্ম যদি জ্ঞান ব্যতীরেকে সম্পাদন হয় তবে সেই কর্ম হবে দুস্কর্ম বা অকর্ম।

ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে যেহেতু পরিবার গড়ে উঠেছে সেহেতু মানুষ তার পরিবার নিয়ে বসবাসের কারণে প্রত্যেক মানুষ তার পরিবারের কল্যাণ ও মঙ্গলের কথা সর্বাগ্রে ভাবতে থাকে। নিজের পরিবারকে কিভাবে সুখে স্বাছন্দে রাখা যায়, উন্নত সমৃদ্ধ জীবন যাপন করানো যায় সেই চিন্তা মাথায় আসে। এই চিন্তার সূত্রপাত হতে অর্থ ও সম্পদ আহরণ ও সংরক্ষণের বিষয়টি সামনের দিকে চলে আসে। অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছিলেন “পৃথিবী টাকার জন্যে কাট হয়ে গিয়েছে” এই ‘কাট’ হওয়ার কারণেই সম্পদ এর আধার হিসাবে অর্থ বা টাকা আহরণ ও সংরক্ষণ করতে গিয়ে একে অপরের মধ্যে প্রতিযোগীতার সৃষ্টি হয়। এই প্রতিযোগীতায় খুব সহজ ভাবে কম সময়ের মধ্যে বিবর্তনের ধারাবাহিকতা লঙ্গন করে দ্রুত বিশাল সম্পত্তির মালিক হওয়ার জন্যে নেতিবাচক দৃষ্টি ভংগি সৃষ্টি হলে অন্যায় ও অবৈধ্যভাবে গায়ের জোড়ে, পেশী শক্তির মাধ্যমে এবং কোন কোন সময় কোন কোন ব্যাক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিযোগীতার বিষয়টি চলে আসে। তখন সমাজে অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবজি, প্রতারণা, গলাবাজি, চাপাবাজি, আত্মীয়তা বলয়, কু-নেতৃত্ব , কর্তৃত্ব সহ যত ধরনের অপশক্তি, অপকৌশল, অপকর্ম রয়েছে সবগুলো ব্যবহার ও প্রয়োগ হতে থাকে। ফলে সমাজের একশ্রেনীর মানুষ বিশাল সম্পত্তির মালিক বনে যাওয়ার কারণে সমাজে অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র ও সম্পদহীন হয়ে পড়ে। প্রভাবশালী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাধারী ব্যক্তিদের হাতে জিম্মি হয়ে সমাজ তখন শাসন ও শোষনের শিকার হয়। সম্পদশালী মানুষেরা সম্পদহীন মানুষদেরকে শ্রমিক হিসাবে ব্যবহার করে এবং ক্ষমতাশালী মানুষেরা ক্ষমতাহীন মানুষদেরকে শাসন, শোষন করে এবং নিজেদের প্রাপ্য থেকে চরম বঞ্চিত করে। তখন একই সমাজে, একই সংগঠন একই প্রতিষ্ঠানে এবং একই রাষ্ট্রে শ্রেণীগত বিভেদ সৃষ্টি হয়। এই সকল বিভেদ দূরীকরণের মাধ্যমে মানুষের সার্বিক কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্যেই রাষ্ট্রের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কারণ রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে শৃঙ্খলার মধ্যদিয়ে সার্বিক কল্যাণ সাধন করে জীবিকা নির্বাহ করার পথ প্রসারিত করা। এই জন্যে মানুষের প্রয়োজনে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে বলেই রাষ্ট্র ছাড়া মানুষের কোন অস্তিত্ব থাকেনা। রাষ্ট্র ব্যতীত যে মানুষ বসবাস করতে পারে সে মানুষ নয়; সে পশু না হয় দেবতা- (প্লেটো)। রাষ্ট্র গঠনের পর মানুষের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে বৈষম্য দূরীকরনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ধনী ও গরীবদের হাতে অর্পন না করেই মধ্যবিত্ত শ্রেনীর হাতে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ধনীদের হাতে ক্ষমতা অর্পন করা হলে ধনীরা অহংকার হতে আরও বেশী অহংকার হবে এবং গরীবদেরকে আরও বেশী শাসন ও শোষন করবে পক্ষান্তরে গরীবদেরকে ক্ষমতা দিলে পূর্বের শোষিত হওয়ার প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে যদি বেপরোয়া হয়ে উঠে! ফলে গরীব ও ধনী শ্রেনীর মধ্যে এবং পূঁজিবাদী ও ক্ষমতাবাদী শ্রেনীর মধ্যে দ্বন্দ সংঘাত লেগে যাবে, সমাজকে তছনছ করে ফেলবে। প্লেটো তাঁর আদর্শ রাষ্ট্র সংক্রান্ত বিখ্যাত গ্রন্থ “দি পলিটিক্স” গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে ধনী ও গরীবদের মধ্যে সম্পদ বন্টন এবং মানুষের সার্বিক কল্যাণের জন্যে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হওয়ার পর সকল মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যে রাষ্ট্র সরকারের মাধ্যমে স্বীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে। এই কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে ধনী ও গরীবদের মধ্যে সংযোগ ও সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে যাতে ধনীলোকদের হাতে গরীবরা নিগৃহীত হতে না হয় এবং ধনীলোকদের অপকর্মের প্রতি হিংসা ও ঘৃণার কারণে গরীবরা সরকারের নির্দেশ উপেক্ষা করলেও ২ শ্রেনীর মধ্যে স্থায়ী দ্বন্দ সংঘাট সৃষ্টি হতে না পারার বিষয়টি বিবেচনায় এনে ধনী ও গরীব উভয় শ্রেনীকে বাদ দিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেনীকে দিয়ে রাষ্ট্র তথা সরকারের দায়িত্ব প্রদান করার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু আধুনিক যুগে রাষ্ট্র মানুষের কল্যাণের জন্যে কাজ করলেও ধনী ও গরীবদের মধ্যে ব্যবধানের প্রতি বিবেচনা রেখে সরকার গঠন করা হয়না। এই যুগে ধনী, প্রভাবশালী এবং লেজুর বৃত্তি যারাই করতে পারেন তাদেরকে নিয়ে সরকার গঠন করা হয় এবং সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। আয়ারল্যান্ডের বাসিন্দা ইংরেজী সাহিত্যের অন্যতম খ্যাতি সম্পন্ন লেখক, কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক অলিভার গোল্ড স্মিথ (১৭২৮-১৭৭৪) বলেছিলেন “কারো যদি টাকা থাকেন তিনি সমালোচকদের নিকট হতে খ্যাতি কিনে নিতে পারেন, তিনি মন্দিরের অভিভাবকদের কাছে স্মৃতি স্তম্ভ।” টাকার প্রভাবে আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রে মনোনয়ন পত্র ক্রয়, কোন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ এর ক্ষেত্রে অযোগ্যকে যোগ্য, অদক্ষকে দক্ষ, অপারদর্শিতাকে পারদর্শিতা, দুর্নীতিবাজকে স্বচ্ছতবান, আদর্শহীন মানুষকে নৈতিক আদর্শবানে পরিনত করে। অপরদিকে ক্ষমতা লোভী, পারিবারিক বলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধতার কারণেও অযোগ্যকে যোগ্য হিসাবে গুরুত্বপূর্ন পদে অরোহনের সুযোগ করে দেয়। ফলে (স্থানীয় প্রশাসন স্বয়ত্তশাসিত, আধা স্বয়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান সহ) রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থানীয় ও উচ্চ পর্যায়ে যিনি নিজেও প্রতিভাবান নৈতিক আদর্শবান এবং মূল্যবোধ ও সৃজনশীল কর্মে পৃষ্ঠাপোষকতা করবেন এবং হিংসুকদের মূঢ় পরশ্রীকতরতার অবসান ঘটাবেন এমন রুচিবান নেতা নির্বাচিত বা নিয়োগ হওয়ার ক্ষেত্রে রাস্তা সংকুচিত হয়ে যায়। কারন মানুষের কল্যাণের জন্যে শুধু ধন সম্পদ প্রভাব প্রতিপত্তি, থাকলে হয়না,- মানুষের সেবার জন্যে বড়মনের মানুষ হওয়া প্রয়োজন, ভাল মানুষ হওয়া প্রয়োজন। যার কারনে সমাজ ও সভ্যতার ইতিবাচক ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্থ হয়, থমকে যায় অগ্রগতির ধারা। কারণ এমনিতেই অযোগ্য ও আদর্শহীন, তার মধ্যে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা, অধিকন্তু যদি তার পিছনে পারিবারিক ও রাজনৈতিক অপশক্তি বিদ্যমান থাকে তবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত লুম্পেন শ্রেনীর মানুষ রাতারাতি সম্পদের পাহাড় গড়ার জন্যে যা যা করা প্রয়োজন সবকিছু করতে থাকে।

যখন সবকিছু করেও পার পাওয়া যায়, জবাবদিহিতা নেই, দুর্নীতির প্রতিবাদের জন্যে সহকর্মী সহকর্মীর হাতে লাঞ্চিত যেখানে হয়, যেখানে কর্তৃপক্ষ প্রত্যক্ষ করেও তার কোন প্রতিকার নেই, যে বটগাছের ছায়াতে কচুগাছও বটগাছ হতে চায় তার পক্ষ হতে যদি কচুগাছের অপকর্মের জন্যে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি তাহলে তালগাছ এক পায়ে দাড়িয়ে নিশ্চয় আকাশের পানে উঁকি মারবে, আকাশ ছুঁটে পারুক নাই পারুক। আর এই দৃশ্য দেখে কর্তৃপক্ষের কাছে মনে হয় ছেলে এবং মেয়ের মধ্যে তফাতের কাহিনীর মতো হয়ে যায়। যেমনি জম্মের পর ছেলেরা হয় মানুষ আর মেয়েরা হয় নারী। তেমনি একই প্রতিষ্ঠানে একই পদে অধিষ্ঠিত হয়েও কাজে, কর্মে, জনসেবায় ও অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে কন্যা সন্তান নারী হয়েই থাকে, আর ছেলে সন্তান হয়ে যায় মানুষ যা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব হিসাবে খ্যাতি, যশ, সুবিধা সবকিছু ভোগ করে করতে থাকে। এতে সমাজে দুর্নীতির সাথে সাথে ভয়ংকর বৈষম্যও সৃষ্টি হয়, লুটেরা, কোটিপতি ও অপশক্তি ধারীদের বেপরোয়া দুর্নীতিও বল প্রয়োগের কারনে জনহিতকর কর্তৃত্ববাদী প্রতিষ্ঠানের চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পারস্পারিক সম্পর্ক এবং সত্য ও ন্যায়ের প্রান প্রকৃতির চুরমার হয়ে যায়; যার ফলে দুর্নীতিবাজদের কালো টাকা ও রাজনৈতিক অপশক্তির কাছে রাষ্ট্রযন্ত্র ধীরে ধীরে অচল হয়ে যেতে পারে। তখন লুটেরাদের কাছে রাষ্ট্রযন্ত্র প্রশ্নহীন রোবট হয়ে অঘোষিত ভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। সরকারের কাঙ্খিত লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়না। মানুষের কাঙ্খিত উন্নয়ন সাধিত হয়না। মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা, বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের এবং সরকারী পর্যায়ের জন প্রতিনিধিদের দেখলে জনগনের চোখে মুখে দৃষ্টিভঙ্গিতে ঘৃনার ভাব ভেসে উঠে, মানুষের আস্থা বিশ্বাসের ঠিকানা হারিয়ে ফেলে। যেখানে সিদ্ধান্ত, ধারণা ও পার্থক্য বিচার বিশ্লেষণ বা পরখ প্রতিপাদনের কোন ব্যবস্থা নেই, সেখানে উচ্চতর কর্তৃপক্ষ, রাজনৈতিক করণীয় উপর ভিত্তি করেই বিশ্বাস অবিশ্বাসের জন্ম হয়, যা পরের মুখে মিষ্টি খাওয়ার মতো। অথচ তখন দুর্নীতিবাজদের নিকট হতে সামান্য সুবিধা পাওয়া লোকজন দুর্নীতিবাজকে জনসভায়, প্রিয়নেতা অন্যতম নেতা, জনপ্রিয় নেতা বলে নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়। অন্য এক শ্রেনীর মানুষ কিছু সুবিধা পাওয়া মাতাল মানুষের হুজুগে দুর্নীতিবাজদের গুনগান গেয়ে থাকে। ফলে দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ব্যাভিচার সম্পন্ন মানুষ গলাবাজি, চাপাবাজির মাধ্যমে কালো টাকা প্রয়োগ করে শীর্ষ নেতৃত্ব পদে অধিষ্ঠিত হয়। এইভাবে বর্তমান সমাজে কালো টাকার মালিক, গলাবাজি, চাপাবাজিদের বেশী মর্যাদা দিয়ে থাকে। কোন সামাজিক কিংবা কোন অনুষ্ঠানের জন্যে যারা দুর্নীতির কালো টাকা বেশী চাঁদা দিতে পারবে তার গুনগানই বেশী গাওয়া হয়। যারা গলাবাজি, চাপাবাজির মাধ্যমে মিথ্যা আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি দিতে পারে তাদেরকেই অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে প্রচার করা হয়। এইভাবে কালো টাকার সান্নিধ্যে সমাজে ও রাষ্ট্রে শীর্ষ সন্ত্রাসী, বড় দুর্নীতিবাজ, বড় গলাবাজি এবং বাটপার বড় লিভারের সৃষ্টি হয়। তাই আমরা দেখতে পায় যে, মানুষ ছোট হতে বৃহৎ হওয়ার পিছনে মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্র কোন ভাবেই দায় মুক্ত নয় এবং আমাদের দৃষ্টিভংগি ও পারিপার্শ্বিক অবস্থাও দায়ী। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপচার্য অধ্যাপক প্রাণগোপাল দত্ত এর একটি লেখা পড়েছিলাম। সেখানে তিনি বট গাছের একটি উদাহরন চমৎকার ভাবে বর্ণনা দিয়েছেন, যা নিম্নে তুলে ধরা হলো:-

“একটি বটগাছে অনেকগুলো সীড জন্মায় কিন্তু সীডগুলো পরিপক্ক অবস্থায় মাটিতে পড়লেও সবগুলো চারা হয়না। কিছু সীড হতে চারা হয়, আবার কিছু সীড হতে চারা হয়না। যে সীডগুলো হতে চারা হয়না সেগুলো মরে পঁচে গিয়ে মাটিকে উর্বর করে তোলে এবং বেচে যাওয়া চারাকে বিরাট বৃক্ষে বৃদ্ধি পেতে সহায়তা করে।” এখানে ড. প্রাণগোপাল দত্ত মহোদয় বলেছিলেন মরে পঁচে সীডগুলো সারে পরিনত না হলে বেঁচে যাওয়া সীড হতে যে চারা হয়েছে সেটি বটবৃক্ষে পরিনত হতে পারতনা। তেমনি যে ‘বটবৃক্ষের ছায়া নিয়ে কচুগাছ’ যে বটবৃক্ষ হতে ছায়া চেয়েছিল সেই বটবৃক্ষ হতে ছায়া না পেলে এবং যে বটগাছের অসংখ্য সীড মাটিতে পড়লেও বীজ হতে চারা না হয়ে পঁচে গিয়ে মাটি উর্বর করেছিল সেইরূপ সুবিধাবাদী রাজনীতির অপসংস্কৃতি এবং রক্ষকদের নিলিপ্তটা না থাকলে, হয়তবা দুর্নীতিবাজদেরও এত ভয়ংকর দুর্নীতি, অনিয়ম, বৈষম্যমূলক কার্যক্রম এবং লাঞ্চিত করা সম্ভব হতো না। যার কারনে দেশে অসুস্থ রাজনীতি ধারা ভ্রাতৃপ্রতিম সমাজে ভূল বুঝাবুঝি, অসুস্থ সমাজ ব্যবস্থা কায়েম হতো না। অসুস্থ সমাজ ব্যবস্থা কায়েম হওয়ার কারনে অসুস্থ দৃষ্ট্ভিংগি নিয়ে পরিছন্নভাবে যেকোন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। যার কারনে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের সাথে আরও অনেক কাজে অনিয়ম ও অপকর্ম হয়। ফলে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি সন্ত্রাসকে অতিক্রম করে ব্যাভিচার, খাদ্যে ভেজাল, কর ফাঁকি, ছিনতাই, দায়িত্বের প্রতি অবহেলা, ভূয়া ডাক্তার, ভুয়া হাকিম, ভূয়া পুলিশ, বর্গা শিক্ষক প্রথা, প্রতারণা, অবিচার সহ নানা ধরনের অপরাধ প্রবনতা সমাজে বিস্তৃত লাভ করে। কারণ তখন মানুষের হৃদয় একটি জায়গায় গিয়ে পৌঁছেসে যে সর্বদা মানুষকে ফাঁকি দিয়ে ছলে বলে কৌশলে কিভাবে অর্থ আদায় করা যায়, ক্ষমতা কিভাবে নিজের মধ্যে, নিজের পরিবারের মধ্যে রাখা যায়! ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে যেমনি সেখানে হতে আরোগ্য লাভ করা খুবই কঠিন এবং তার চিকিৎসার জন্যে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের প্রয়োজন, তেমনি সমাজের এই অবস্থা উত্তরণ হতে গেলে দক্ষ চিকিৎসকের ন্যায় দক্ষ রাষ্ট্র নায়কের জরুরী প্রয়োজন। প্লেটোর গুহার রূপক গল্পটি এখানে প্রণিধাণ যোগ্য। তার মতে, ‘গুহার মধ্যে শৃঙ্খলিত বন্দিরা কেবলমাত্র ছায়াকেই জানতে পারে, সত্যজ্ঞানকে নয়; তারা ছায়াকেই জ্ঞান(আলো) মনে করে।” যার কারণে গুহার বন্দিরা বেড়িয়ে তীব্র আলোতে আসলেও প্রথম প্রথম অন্ধের মতো হয়ে যায়। দীর্ঘদিন গুহাতে থাকার কারণে মনে করেছিল গুহাতেই তারা ভাল ছিল, যেখানে তারা অন্ধকার বা কালো ছায়াকে সত্য বলে মনে করেছিল। কিন্তু তারা দীর্ঘদিন আলোতে থাকলেই পরে তাদের দৃষ্টিভংগি পরিবর্তন হয়ে আলোকে প্রকৃত আলো এবং সত্যকে প্রকৃত সত্য বলে মনে করবে। তখন ছায়া ও আলোর পার্থক্য তথা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারবে। যখনি আমরা এই আলোও ছায়ার পার্থক্যকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারব তখনি দেশের মানুষ সৎ, ন্যায় নীতিবান হয়ে উঠবে এবং সৎ, ন্যায় নীতিবান জনপ্রতিনিধিকে সত্যিকার জননেতা জনপ্রিয় নেতা, অন্যতম নেতা হিসাবে মনে করবে, তখন কালো টাকার মালিক, গলাবাজ, চাঁপাবাজ, ব্যভিচার সম্পন্ন নেতাকে বাদ দিয়ে সত্যিকার জননেতা, জনপ্রিয় নেতাকে খুজে বের করবে। নির্বাচিত বা নিয়োগকৃত নেতারা ও প্রকৃত সৎ, ন্যায়, নীতিবান হয়ে অনেক ঘৃনিত কাজ পরিহার করে সত্য সুন্দরের পূজারী হয়ে কাজ করবে। তার পাশাপাশি সরকারের যারা শীর্ষ পর্যায়ে অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন তাদেরকেও অন্ধকার ও আলোর পার্থক্যের বিচারে আলোর দৃষ্টিভংগি নিয়ে সৎ, আদর্শবান ব্যক্তিকে রাষ্ট্রও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগদান করবে এবং কর্মজীবিসহ সকল মানুষকে সত্যজ্ঞানের উপর ভিত্তি করেই সৎ ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করবে। তাহলে দেশ সত্য সুন্দর হবে, এগিয়ে যাবে সমাজ সংস্কৃতি, বিকশিত হবে মানব সভ্যতা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এদেশকে ক্ষুধা দারিদ্রমুক্ত উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ কায়েম করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার রূপান্তর করার জন্যে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উপলব্ধি করেছেন দেশে এই মহান স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে গেলে দেশের দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসীসহ সকল ধরনের অপকর্ম বন্ধ করতে হবে। মানুষের দৃষ্টিভংগি নেতিবাচক হতে ইতিবাচক এ উত্তরণ ঘটাতে হবে। একজন ডাক্তার অসুস্থ রোগীকে যেভাবে দক্ষতার সহিত চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন, তেমনি একজন দক্ষশাসক অনগ্রসর ও পশাৎপদ রাষ্ট্রকে দক্ষ হাতে উন্নত সমৃদ্ধের পথে নিয়ে যান। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা স্বল্পোন্নত এই দেশকে দক্ষতার সহিত পরিচালনা করে উন্নত সমৃদ্ধের পথে ধাবিত করছেন। এই উন্নত সমৃদ্ধকে আরও অধিকতর গতিশীল করতে হলে শোষকদের হাত থেকে শোষিতাদের মুক্ত করতে হবে। ১৯৭৩ সালে ৯ই সেপ্টেম্বর তারিখে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে ভাষণ দিেেত গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন “বিশ্ব আজ ২ভাগে বিভক্ত- শোষক ও শোষিত; আমি শোষিতদের পক্ষে।” তাই বঙ্গবন্ধুর তনয়া জননেত্রী শেখ হাসিনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এদেশকে প্রকৃত পক্ষে সোনার বাংলায় রূপান্তর করতে শোষিতদের পক্ষ হয়ে শোষকদের কার্যক্রম বন্ধ করার অভিযান শুরু করে দিয়েছেন। যে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং দেশের ৯৯% ভাগ মানুষ মনে করেন তিনি দেশকে দূর্নীতিমুক্ত করতে পারবেন। আমি মনে করি এই অভিযানের উদ্দেশ্যকে সফল বাস্তবায়নের জন্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করা জরুরী প্রয়োজন। কেননা আমরা জানি যে, কোন বিশেষ উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই একটি সুষ্ঠ পরিকল্পনা এবং সুষ্ঠ নীতিমালার প্রয়োজন। একটি সমীক্ষায় চীনা ভাষায় একটি কোটেশন এ দেখা যায় যে কোন কিছু কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্যে স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের ব্যাপারে সেখানে বলা হয়েছে। এতে উল্লেখ ছিল যদি,

  • ১.একবসরের পরিকল্পরা গ্রহণ করলে ধান গাছ রোপন করতে হবে,
  • ২. ৩০বসরের পরিকল্পনা গ্রহণ করলে গাছ রোপন করতে হবে এবং
  • ৩. ১০০বসরের পরিকল্পনা করলে প্রকৃত মানুষ তৈরী করতে হবে। তাই দেশে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করতে হলে দীর্ঘমেয়াদী সুষ্ঠ পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন; যে পরিকল্পনার মাধ্যমে আমাদের দৃষ্টিভংগি, মানবিক মূল্যবোধ, রাজনীতি, আচরণ ইত্যাদি পরিবর্তন হবে।

নিম্নে এই বিষয়ে কিছু প্রস্তাব পেশ করা হলো:-

১.প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাশ শুরু হওয়ার আগে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর দুর্নীতি বিরোধী কার্যক্রমের অংশ হিসাবে সকল ছাত্র-ছাত্রীদেরকে “আমরা দুর্নীতি করবনা এবং অপরকে করতে দেবনা” মর্মে প্রতিজ্ঞা করাতে হবে।

২.সচিবালয়, বিভাগ, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে “জাতীয় দুর্নীতি প্রতিরোধ দিবস” আকর্ষনীয় ভাবে পালন করতে হবে; এই অনুষ্ঠানে দুর্নীতির কুফল বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা এবং ম্যাগাজিন/শুভ্যেনীর প্রকাশের সুযোগ রাখতে হবে।

৩.সচিবালয়, বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে দুর্নীতি দুরীকরণের বিষয়ে ত্রৈমাসিক সমন্বয় সভা করতে হবে।

৪.রাজধানী, বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এবং সকল সেক্টরের বড় বড় দুর্নীতিবাজদেরকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং সকলকে সর্তক করে দিতে হবে।

৫.অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন প্রদান, পোষ্টিং, পদায়ন, চাকুরী বিকিকিনি বন্ধ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৬.জনপ্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার পর ব্যাংক হিসাবসহ সকল স্থাবর এবং অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব নিতে হবে এবং ফি-বসর এই হিসাব দেয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। অনুরূপভাবে চাকুরীজীবিদের বেলায়ও এই নিয়ম কার্যকরী করতে হবে।

৭.দুর্নীতি দমন আইন সংশোধন সহ অত্র প্রস্তাবিত গুচ্ছের ১,২,৩,৪,৫,৬,৯,১০ ও ১১নং ক্রমিক এ বর্নিত সকল প্রস্তাবিত বিষয় কার্যকরী করার জন্যে প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও আইন প্রনয়ন করতে হবে।

৮.ব্যাংকিং নীতিমালা (ব্যাপক সংশোধন সহ) প্রনয়ন করতে হবে, যে নীতিমালায় সকল গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব কেন্দ্রীয় ব্যাংক/ বাংলাদেশ ব্যাংক এ অনলাইনে নিয়মিত জমা হবে, যাতে দুদক কিংবা প্রয়োজনে সরকারের কোন ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি চাহিবামাত্র জানতে পারে।

৯.দুর্নীতিবাজদের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিকভাবে বয়কট করতে হবে। দুর্নীতিবাজ সরকারী চাকুরী জীবিদেরকে প্রশাসন এবং উন্নয়নমুলক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বাপূর্ণ পদে পোষ্টিং প্রদানের ক্ষেত্রে অনুৎসাহিত হতে হবে এবং জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুর্নীতিবাজ ও অযোগ্য ব্যক্তিদেরকে কোনক্রমে মনোনয়ন ও অধিষ্ঠিত করা হতে বিরত থাকতে হবে।

১০.আগামী প্রজন্ম যাতে দুর্নীতিকে ঘৃণাভরে বর্জন করেন তার জন্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে দুর্নীতির কুফল সম্পর্কিত লেখা পাঠ্য পুস্তকে অর্ন্তভূক্ত করতে হবে। এবং লেখক, কবি, সাহিতিক, নাট্যকারদেরকে দুর্নীতি বিরোধী লেখা প্রকাশের জন্যে উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে।

১১.চাকুরীজীবি এবং জনপ্রতিনিধিদেও মধ্যে যারা স্বচ্ছতার সহিত দায়িত্ব পালন করবেন তাদেরকে বিশেষ আর্থিক প্রনোদনা সহ সম্মাননা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

ভারতীয় দর্শনের বর্ণনায় আত্মা, পরমাত্মা এবং দেহের সম্মিলনের কথা বলা আছে। আত্মার অর্ন্তমুখীতার মাধ্যমে পরামাত্মা বা প্রাণের সাথে একাত্বতা হয়। যে যতবেশী অর্ন্তমুখীতা অর্জন করা সম্ভব হবে ততবেশী সে পরামাত্মার সাথে একত্রিত হতে পারবে। তখন ততবেশী তিনি মানবিক গুনাবলী অর্জন করা সম্ভব হবে। ব্রম্ম বা পরমাত্মার সাথে একাত্বতা অর্জন করে চুড়ান্ত মানবিক গুনাবলী অর্জন করাই মানব জীবনের চুড়ান্ত লক্ষ্য। তাই আত্মার অনুশীলন ও বিকাশের মধ্য দিয়ে মানুষকে নানা আসক্ত হতে উত্তরণ ঘটিয়ে উচ্চতর আধ্যত্মিক পর্যায়ে জ্ঞান অর্জন করে দেবতার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়। অনুরূপভাবে, আধুনিক রাষ্ট্রে শাসন ব্যবস্থার পদ্ধতিকে আত্মা পরমাত্মা এবং মানবদেহকে আমরা যদি রাষ্ট্র এবং সরকারেরর সাথে তুলনা করলে বলতে হবে যে রাষ্ট্র হচ্ছে দর্শন, জনগন হচ্ছে মানবদেহ, সরকার (রাষ্ট্রযন্ত্র) হচ্ছে আত্মা এবং সরকার প্রধান হচ্ছেন পরমাত্মা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাই এদেশের পরামত্মা। তার পরিকল্পনা ও গৃহীত কমসূচী বাস্তবায়ন করতে গেলে আত্মা কে যেমনি অর্ন্তমুখীতার মাধ্যমে পরমাত্মার সাথে একত্রিত হওয়া সম্ভব তেমনি সরকার কে স্বচ্ছতার মাধ্যমে স্ব স্ব দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা সম্ভব। আত্মাকে অর্ন্তমূখীতার মাধ্যমে সাধনা করে পরমাত্মার সান্নিধ্য পেয়ে চুড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে যেমনি মানুষকে দেবতার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয় তেমনি সরকারকে ন্যায়, নীতি ও আর্দশের মাধ্যমে কাজ করে চুড়ান্ত সাফল্য আইন অর্জন করাই হচ্ছে সরকারের একমাত্র মহান লক্ষ্য। অতএব রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে সম্পৃত্ত জনপ্রতিনিধি সহ সকল ব্যাক্তি যদি ন্যায় নীতি ও আদর্শের মাধ্যমে কাজ করেন তবে রাষ্ট্রও চুড়ান্ত লক্ষ্যে পৌছা সম্ভব হয়। একটি কথা সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, গভীর বেদনা হতে মানুষকে জেগে উঠতে হয় প্রেম দিয়ে, আবেগ দিয়ে, স্বার্থ হতে জেগে উঠলে সেটি টেকসই হয়না সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয়না। তাই আসুন বর্তমানে দেশে যে সমস্ত অপকর্ম হচ্ছে সেগুলো দেখে সকলেই গভীর বেদনা অনুভবের মাধ্যমে অনুভূতি প্রকাশ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্যে সকলকে স্ব স্ব অবস্থান হতে আন্তরিক ভাবে সংবেদনশীল ও মূল্যবোধ দিয়ে কাজ করে এদেশকে ক্ষুধা দারিদ্রমুক্ত উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু স্বপ্নের সোনার বাংলা কায়েম করার জন্যে সকলকে উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি।

লেখক- সদস্য, পার্বত্য জেলা পরিষদ, খাগড়াছড়ি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান, লতিবান এবং বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক।

Share this:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *