পাশে আছে সেনাবাহিনী, ভরসা রাখুন

 552 total views,  2 views today

পারভেজ হায়দার

বাংলাদেশের মত জনবহুল একটি দেশে সাম্প্রতিক সময়ে করোনা ভাইরাসের মাধ্যমে সৃষ্ট কোভিড-১৯ রোগটি গভীর চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাইরাস জনিত এই রোগটি দমনে এখন পর্যন্ত কোন প্রকার প্রতিষেধক কিংবা ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত না হওয়ায় সোস্যাল ডিসটেনসিং অর্থাৎ সামাজিক ভাবে একে অন্যের সাথে অনুমোদিত নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখা এবং ব্যক্তিগত কিছু সতর্কতা যেমনঃ বিশ সেকেন্ড ধরে সঠিকভাবে হাত ধোয়া, হাঁচি ও কাশি দেওয়ার সময় সাবধানতা অবলম্বন করা সহ নিজস্ব বসবাস এলাকায় যথাসাধ্য নিয়ম মেনে চলা ইত্যাদি বিষয়াদি খুব গুরুত্বপূর্ন। এই কোভিড-১৯ রোগটি যেহেতু একজনের কাছ থেকে অন্যজনের কাছে সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে সেজন্য কিছু মানুষের ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে পুরো জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বিষয়টি বিবেচনায় এনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিত করা এবং বেসামরিক প্রশাসনকে অন্যান্য সহযোগীতা করার জন্য জনগনের আস্থার প্রতিক সেনাবাহিনীকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছেন। তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পাশাপাশি নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর ছোট কয়েকটি দলও একই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমদ, বিএসপি, বিজিবিএম, পিবিজিএম, বিজিবিএমএস, পিএসসি, জি, তার দুরদর্শী নেতৃত্ব গুনাবলীর কারণে আগে থেকেই সরকারের সম্ভাব্য এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অনুমান করে প্রাক প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাই সরকারের সিদ্ধান্ত পাওয়ার সাথে সাথেই সেনাবাহিনী কাল বিলম্ব না করে মাঠ পর্যায়ে কাজে নেমে পড়ে। সরকারের কাছ থেকে দায়িত্ব পাওয়ার পর জেনারেল আজিজ আহমদ মন্তব্য করেছিলেন, আমরা সৈনিক, আমরা সবসময় যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী করোনা মোকাবেলায় যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন, একজন সৈনিক হিসাবে সরকারকে এবং দেশ ও জনগনের জন্য যা যা করা প্রয়োজন সবকিছুই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী করবে। জেনারেল আজিজ আহমদ তার পরিনত নেতৃত্ব গুনাবলী ও পেশাদারিত্ব ব্যবহার করে মাঠ পর্যায়ে তার অধিনস্তদের মাধ্যমে কাজ শুরুর প্রাক্কালে তড়িৎ অথচ সময়োপযোগী প্রস্তুতি নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। কোভিড-১৯ যেহেতু একটি ভাইরাসজনিত রোগ তাই সেনাসদস্যদের মধ্যে যারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করবে তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টিও তাকে বিবেচনায় রাখতে হয়েছিল।

করোনা ভাইরাস জনিত বিষয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কার্যক্রম শুরু হয়েছিলো ঢাকাস্থ আশকোনার হাজী ক্যাম্প এলাকা থেকে। বিশ্বের বিভিন্ন করোনা ভাইরাস সংক্রমিত দেশ ইতালি, চীন, জার্মানী এবং স্পেনসহ অন্যান্য দেশ থেকে তখন প্রবাসীরা হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশ করছিল। তাদের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস দেশের অন্যান্য জায়গায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশংকা ছিল। শুরুর দিকে আশকোনাস্থ হাজী ক্যাম্পে বিপুল সংখ্যক প্রবাসীদের অবস্থান করানো হচ্ছিল। তখন সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে ঐ স্থানের অব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছিল ; সেনাবাহিনী দ্রুত ঐ ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রন গ্রহণের পর থেকে প্রবাসীদের ব্যবস্থাপনা চিকিৎসা শাস্ত্রে বর্ণিত পদ্ধতির মাধ্যমে সুচারুরূপে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছিলো। ফলশ্রুতিতে দেখা গেছে করোনা ভাইরাস আশংকাজনক ভাবে সারা দেশে তেমনভাবে ছড়াতে পারেনি।বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশের করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় আছে।

ছবি: করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত মনস্তাত্ত্বিক প্রচারনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

সরকার কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে সারা দেশে উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে বিভিন্ন সংস্থা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে এর মূখ্য ভূমিকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিতে হচ্ছে। সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখাসহ অন্যান্য কার্যকরী পদক্ষেপ, যা করোনা ভাইরাস সংক্রমিত করতে বাঁধাগ্রস্ত করবে এসকল প্রতিটি বিষয়ই নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যগণ মাঠ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দৈনন্দিন জীবন ধারণের প্রয়োজনে সাধারণ মানুষকে এমনিতেই মাঝে মাঝে রাস্তায় বের হতে হচ্ছে যেমনঃ জীবন ধারনের জন্য বাজার করা, ঔষধ সংগ্রহ করা ইত্যাদি; এই সময়গুলো যাতে মানুষ অনুমোদিত নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখে, মাঠ পর্যায়ে সেনাবাহিনী তা নিশ্চিত করছে। শুধুই কি তাই, সেনাবাহিনীর সদস্যগণ করোনা ভাইরাস সংক্রমণ থেকে মুক্তি পেতে করণীয় বিষয় সম্পর্কে জনগণকে ক্রমাগত মনোস্তাত্ত্বিক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।

ছবি: সেনাসদস্যরা মানুষের বাড়িতে বাড়িতে ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের মানুষের একটি বড় অংশ দৈনন্দিন উপার্জনের উপর নির্ভরশীল। বর্তমান সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার স্বার্থে অনেকের পক্ষেই দৈনিক উপার্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। সেনাবাহিনীর সদস্যগণ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় এই সকল সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের কাছে প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী ও রশদ পৌঁছে দিচ্ছে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধ কল্পে সবসময় মুখে মাস্ক ব্যবহার, প্রয়োজন ক্ষেত্রে হাতে গ্লাভস এবং যারা সরাসরি রোগী কিংবা সাধারণ মানুষদের সাথে সরকারি প্রয়োজনে যোগাযোগ রাখতে হচ্ছে তাদের পিপিই (পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুপমেন্ট) পরিধান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যগণ তাদের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই সকল সংক্রমণরোধী সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন।

ছবি: সেনাসদস্যদের মানবিক ভূমিকা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাধারণ মানুষদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন। তার মধ্যে ওএসএম প্রোগ্রামের মাধ্যমে ১০ টাকা কেজি দরে চাল, ১৮ টাকা কেজি দরে আটা, ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে রেশন প্রদান ছাড়াও নানা জনকল্যাণমূখী প্রকল্প রয়েছে। সরকারের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপগুলি বাস্তবায়নে সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসেনকে সহায়তায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। সাধারণ মানুষের জন্য সরকারের গৃহীত ব্যবস্থাবলী যাতে সত্যিকার অর্থেই অসহায় মানুষদের কাছে পৌঁছায় এবং এবিষয় নিয়ে যাতে কোন দূর্নীতি না হয় তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী বদ্ধপরিকর।

ছবি: জনগনকে সঠিক পদ্ধতিতে হাত ধোয়ায় উদ্বুদ্ধ করছে সেনাসদস্যরা।

সেনাবাহিনীর সদস্যদের কাজ মূলত: দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সদা প্রস্তুত থাকা, কিন্তু এই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যগণই বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী হিসাবে প্রভৃত সাফল্য অর্জন করেছে। ইতিপূর্বে দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে সেনাবাহিনী সবসময় সর্বাত্নকভাবে সরকারকে সহযোগীতা করেছে। কিন্তু অন্য সবসময়ের তুলনায় দেশ ও জনগণের স্বার্থে সেনাবাহিনীর এবারের ভূমিকাটি একটু অন্য রকম। কারণ দেশের মানুষের কল্যাণে সেনাসদস্যরা কাজ করার সময় সাবধানতার ঘাটতি থাকলে তারা নিজেরাও করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে পড়তে পারে। জেনারেল আজিজ আহমদ এক্ষেত্রে একজন খাঁটি নেতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি তার অধীনস্থ সকল সদস্যদের করোনা ভাইরাস নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সম্ভাব্য সবকিছুই করেছেন। এরপর তিনি তাদের নির্দেশ দিয়েছেন করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে। জেনারেল আজিজ আহমদ শুধুমাত্র বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদবীধারী ব্যক্তিত্ব হিসাবে তার অধিনস্তদের আদেশ দেননি বরং একজন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতা হিসাবে তার অধিনস্থদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন। এজন্যই বোধকরি করোনার মত মরণঘাতি মহামারির মধ্যেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সকল সদস্যগণ নিরলসভাবে পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশবাসী করোনা মহামারির এই পর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দীক্ষিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপর পরিপূর্ণ আস্থা রাখবে।

পারভেজ হায়দার
পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আঞ্চলিক রাজনীতি বিয়ষক গবেষক
ইমেইল- parvedgehaider5235@gmail.com

Share this:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *